চট্টগ্রাম টুডে ডেস্ক
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ৮২৪টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। সংগঠনটি এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে একটি স্বাধীন জুডিশিয়াল কমিশন গঠন এবং ট্রানজিশনাল জাস্টিস বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিজ (HRCBM) সংগঠনটি এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে একটি স্বাধীন জুডিশিয়াল কমিশন গঠন এবং ট্রানজিশনাল জাস্টিস বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলা ও ৮টি বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, তথ্যগুলো বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম, সাংবাদিক, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, জেলা-উপজেলা সমন্বয়ক ও পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে। এ তথ্য সংকলনে জ্যোতি বাছাড় কাজ করেছেন এবং মাঠপর্যায়ে সত্যতা যাচাইয়ে সমন্বয় করেছেন আশীষ কুমার অঞ্জন ও দেবীচরণ রায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত ৮২৪টি ঘটনার মধ্যে রয়েছে—২৩৪টি ভূমি দখল, সম্পত্তিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, ২২৩টি অপহরণ ও শারীরিক হামলা, ১৬৮টি হত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যু, ১৪১টি মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর, ৪১টি ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতা, ১৭টি ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা।
প্রতিবেদনে সংখ্যালঘুদের রহস্যজনক মৃত্যু, ঝুলন্ত মরদেহ বা ভাসমান লাশ উদ্ধারের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মব সহিংসতায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি তাঁর পরিবার, প্রতিবেশী ও উপাসনালয়ও হামলার শিকার হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক সংখ্যালঘু কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে HRCBM জানিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে—অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে এবং উদ্ধার হওয়া অনেকেই যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যৌন সহিংসতার প্রকৃত সংখ্যা নথিভুক্ত ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। সামাজিক কলঙ্ক, ভয়ভীতি, প্রশাসনিক ও চিকিৎসা সহায়তার ঘাটতি এবং বিচারহীনতার আশঙ্কায় অনেক পরিবার অভিযোগ দায়ের করতে আগ্রহী হয় না।
HRCBM-এর ভাষ্য, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে প্রায়ই ব্যক্তিগত বিরোধ বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, ফলে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত হয় না এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে এবং দেশত্যাগের প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে।
সংগঠনটি সরকারের প্রতি দ্রুত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জুডিশিয়াল কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অতীত ও বর্তমানের সব ঘটনার সত্যতা যাচাই, দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
HRCBM আরও বলেছে, মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে সরকার, বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এসব অপরাধ দমনের জন্য সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিন দফা সুপারিশ করা হয়েছে। দফাগুলো হল ১. নিরপেক্ষ জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করে জরুরি তদন্ত। ২. তদন্ত শেষে দায়ীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ৩. ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ।
প্রতিবেদনের শেষাংশে HRCBM-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ধীমান দেব চৌধুরীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, “বেছে বেছে মানবাধিকার প্রয়োগ করা যায় না। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরাও একই সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী, যা বিশ্বের অন্যত্র দাবি করা হয়।”
উল্লেখ্য, উপরের সব পরিসংখ্যান, অভিযোগ ও দাবি হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিজ (HRCBM)-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবি।
