শুক্রবার সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ভোরের দিকে ইসরায়েলের হামলা ও স্থল অভিযানে বেইত জিন শহর থেকে বহু পরিবার নিরাপদ স্থানে পালিয়ে গেছে।
খবরে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলি ড্রোন এখনও ওই এলাকায় উড়তে দেখা যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দক্ষিণ সিরিয়ায় দখলদারিত্ব বিস্তারের মধ্যে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অভিযানগুলো আরও ঘনঘন ও সহিংস হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি ওই অঞ্চল থেকে রিপোর্ট করেছেন আল জাজিরার প্রতিবেদক ওসামা বিন জাভিদ। তিনি বলেন, সর্বশেষ হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, হামলায় তাদের ছয়জন সৈন্য আহত হয়েছে, তিনজনের অবস্থা গুরুতর।
তাদের দাবি, অভিযানটি সম্পন্ন হয়েছে এবং সব সন্দেহভাজনকে হয় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, না হয় ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে। তবে তারা এলাকায় অবস্থান করছে এবং ‘ইসরায়েলের জন্য যেকোনো হুমকির’ বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে।
ইসরায়েলি পত্রিকা ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, বেইত জিনে প্রবেশ করা একটি ইসরায়েলি দলকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। তাদের উদ্ধার ও প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে আকাশপথে ও স্থলে অভিযান চালানো হয়। এতে বহু সিরিয়ান নিহত ও আহত হয়।
এলাকায় ইসরায়েলি হেলিকপ্টারের গুলিবিনিময়ের ঘটনাও ঘটে, যখন ইসরায়েলি বাহিনী শহরে প্রবেশ করে।
সিরিয়ায় ইসরায়েলের অনুপ্রবেশ, বোমাবর্ষণ ও আটক অভিযান
ইসরায়েলি সেনারা প্রায়শই কুনেইত্রা প্রদেশ ও দামেস্কের গ্রামাঞ্চলে সিরিয়ার ভেতরে স্থলঅভিযান চালায়।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আকিভা এলদার আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের কিছু মহল সিরিয়ার সীমান্তে যেকোনো অস্থিরতাকে সামরিক অভিযানের ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করে এবং একটি নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করতে চায়।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিরিয়ান গোলান মালভূমি দখল করে ইসরায়েল। আল আসাদের পতনের পর ইসরায়েল ১৯৭৪ সালের সীমান্ত-চুক্তি ভেঙে আরও ভেতরে ঢুকে নতুন দখলকৃত অঞ্চলকে ‘বাফার জোন’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যার মধ্যে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জাবাল আল-শেখ শিখরও আছে।
আল আসাদের পতনের আগেই ইসরায়েল সিরিয়ায় হামলা চালাতো মূলত ইরানের প্রভাব মোকাবিলার নামে। কিন্তু পরে নতুন পথ খোঁজার বদলে ইসরায়েল এই বোমাবর্ষণ আরও বাড়িয়েছে। এ বছর শুধু দামেস্কেই বহু হামলা চালানো হয়েছে, সেনাদের হত্যা করা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
এ মাসের শুরুতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দক্ষিণ সিরিয়ার দখলকৃত এলাকায় সৈন্যদের সঙ্গে উপস্থিত হলে সিরিয়া তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এতে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে সন্দেহ আরও গভীর হয়।
কুনেইত্রাজুড়ে ইসরায়েলি ট্যাংক চেকপয়েন্ট ও টহল বসিয়েছে, এমনকি গেটও স্থাপন করেছে। তারা বেসামরিকদের থামিয়ে তল্লাশি করে, অনেককে তুলে নিয়ে যায়।
ইসরায়েল যেগুলোকে ‘নিরাপত্তা অভিযান’ বলে বর্ণনা করে, সিরিয়া সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো সেগুলোকে অপহরণ বা বেআইনি আটক বলে মনে করে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রায় ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে খবর আছে।
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ধকল ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
ইসরায়েলের হামলা ও অনুপ্রবেশের পাশাপাশি, প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নবগঠিত সরকারকে ১৪ বছরের বিধ্বস্ত গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণেও লড়াই করতে হচ্ছে। দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধীরে ধীরে ফিরছে এবং অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পাচ্ছে।
সর্বশেষ ইসরায়েলি অভিযানের ঘটনা ঘটল এমন এক সময়ে, যখন আল শারার সরকার ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আল আসাদের পতনের বার্ষিকী পালন করছে। বৃহস্পতিবার আল শারা দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই উপলক্ষ উদযাপনের আহ্বান জানান।

