চট্টগ্রাম টুডে

সন্দ্বীপে বেড়েছে অভিনব কায়দার চুরিঃ অধরা থাকছে চোর চক্র

চট্টগ্রাম টুডে ডেক্স

সন্দ্বীপ উপজেলার আমানউল্লাহ ইউনিয়ন বিএনপি সাধারণ সম্পাদক ও সন্দ্বীপের বৃহত্তম বাজার আকবর হাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আলমগীর মেম্বার। গত কয়েক দিনে তার নিজ ইউনিয়নে স্প্রে ব্যবহার করে চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। পরদিন তারই ঘরে দুর্ধর্ষ চুরি হয়। রাতে ঘরে চোর ঢুকে নগদ সাড়ে তিন লাখ টাকা সহ স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়।

গত ৩০ নভেম্বর সন্দ্বীপ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ব্যবসায়ী হাসানের বাড়িতে দিনের বেলায় দুর্ধর্ষ চুরি হয়। ভুক্তভোগী হাসান জানান, সেদিন বাড়িতে তার স্ত্রী ও কন্যা শিশু ছাড়া কেউ ছিল না। বাড়ির মেইন গেটের পাশের টিন খুলে একজন মহিলা  ঘরের দরজার পাশে উৎ পেতে থাকে। এক পর্যায়ে তার স্ত্রীকে কোনো কিছু বুঝার আগেই চেতনানাশক স্প্রে করে অচেতন করে বাসায় প্রবেশ করে আলমারি ভেঙে ২ ভরি স্বর্ণ নিয়ে পালিয়ে যায়।

এভাবেই প্রতিদিন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে চুরির ঘটনা। চুরির কাজে অভিনব কায়দায় চেতনানাশক স্প্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক দিনে একই ইউনিয়নের চার ঘরে চুরি হয়েছে। তবে চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পেলেও পুলিশ প্রশাসন এখনো কোন চোরকে আটক করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে গ্রামবাসী বাড়িঘর পাহাড়া দিচ্ছে। অনেক এলাকায় মাইকিং পর্যন্ত করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। 

২৪ নভেম্বর রাতে সন্তোষপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমানত আলী সেরাংয়ের বাড়ির মিজানুর রহমানের ঘরে রাতে চুরি হয়। ঘরের সদস্যদের ধারণা, চেতনানাশক ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের অচেতন করে তাদের ঘর চুরি করেছে। চোরেরা রাতে ঘরে ঢুকে আলমারি ভেঙে জিনিসপত্র ও টাকা চুরি করলেও তারা কিছু টের পাননি। গৃহকর্তা মিজানুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার শোবার ঘর থেকে একটি ব্রিফকেস নিয়ে গেল, লোহার আলমারি ভেঙে সব জিনিসপত্র ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রেখে গেল—আমি, আমার স্ত্রী আর মা কিছুই টের পাইনি। আমরা সবাই অচেতন ছিলাম।’

একই রাতে ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের স্কুল শিক্ষক মুহম্মদ শাহাব উদ্দীনের ঘরেও চুরির ঘটনা ঘটে। মাস্টার সাহাব উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, সোমবার দিবাগত রাতে আমাদের বাসস্থানে চোর স্প্রে বা অনুরূপ অপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের পুরো পরিবারকে অচেতন করে ঘরে লুটপাট চালায়। ফজরের আযানে জাগ্রত হয়ে দেখি—আলমারির তালা ভাঙা, ঘরের সব জামাকাপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এবং বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল নেই। চোরেরা তার ঘর থেকে আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন নগদ ২৫ হাজার টাকা সহ মূল্যবান জামা কাপড় ও দামী জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, ঘটনার পরপরই আমি সন্দ্বীপ থানার ওসি মহোদয়কে ফোন করি। তাঁর নির্দেশে সাব-ইন্সপেক্টর কাওছার সাহেবের নেতৃত্বে একটি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর থেকে বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হলেও, এখনো এ ঘটনার কোনও সুরাহা হয়নি।

এর আগের রোববার রাতে একই কায়দায় চুরি হয় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রবাসী ফরিদ উদ্দিনের ঘরে। ফরিদ বলেন, ‘বিকেল থেকেই ঘরের সবার ঝিমুনি ছিল। রাতে অন্যদিনের তুলনায় আগেই  ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করে স্বর্ণালংকার, টাকা ও মুঠোফোন চুরি করা হয়েছে। কে আমাদের এভাবে ঘুম পাড়িয়ে সবকিছু চুরি করে নিয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইব্রাহীমের ঘরেও চুরির ঘটনা ঘটে। ইব্রাহীম বলেন, ‘শুক্রবার বিকেল থেকেই আমি এবং আমার স্ত্রীর ঝিমুনি শুরু হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ি। রাতে পুরো ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করে দেড় ভরি স্বর্ণালংকার ও ৭০ হাজার টাকা চুরি করা হয়েছে। আমার পাকা ঘরে কোন দিক দিয়ে চোর ঢুকেছে, সেটিও বুঝতে পারছি না। যতটুকু মনে পড়ে, আমরা দরজা বন্ধ করেই ঘুমিয়েছি।’

গত রবিবার মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গাজী বাড়িতে এক প্রবাসীর ঘরে চুরির চেষ্টা চালায়। তবে গৃহকর্ত্রী সজাগ থাকায় চোরেরা ব্যার্থ হয়। একই কায়দায় বাউরিয়া ইউনিয়নেও চুরির চেষ্টা হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও প্রতিদিন উপজেলার কোথাও না কোথাও চুরির চেষ্টা ও ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা আরো বলেন, রাতের বেলায় ঘরের বাইরে থেকে ডাকাডাকি করে। দরজা বা জানালা খুললেই বাইর থেকে চেতনানাশক স্প্রে ছড়িয়ে দেয়। এতে তারা শারীরিকভাবে অসুস্থবোধ করেন এবং আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এ নিয়ে সন্দ্বীপ জুড়ে চরম উদ্বেগ ও আলোচনা শুরু হয়েছে।পাশাপাশি এখনো পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনের কোন কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়ায় জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সন্দ্বীপ থানার পুলিশের ওসি শফিকুল আলম সংবাদমাধ্যমকে বলেন , অনেকগুলো ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছি জড়িতদের আটকের তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঘটনাগুলো গুরুতর হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ কাজ করছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সন্দ্বীপে স্প্রে প্রয়োগের মাধ্যমে চোর-ডাকাত চক্রের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম অনিরাপত্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের নজীরবিহীন নিরবতাও জনমনে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

বিষয়:

বিশেষ প্রতিবেদন

সর্বশেষ

Find Us on Youtube