নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে Human Rights Congress for Bangladesh Minorities (HRCBM)। সংস্থাটির কনভেনর অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতা আজ ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটে রূপ নিয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আশিষ কুমার অঞ্জন (কো-অর্ডিনেটর), রাজ চাকমা (হিউম্যান রাইটস অ্যাসিস্ট্যান্ট), সন্তোষ কুমার মাহাতো (অবজারভার), টুকু বাছাড় (হিউম্যান রাইটস অ্যাসিস্ট্যান্ট), সমীর চন্দ্র মিস্ত্রী (হিউম্যান রাইটস অ্যাসিস্ট্যান্ট) এবং বিমল কান্তি চাকমা (কো-অর্ডিনেটর, পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙামাটি) প্রমুখ।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে উদ্বেগ
HRCBM জানায়, তাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুন ২০২৫ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের মোট ৫৬৮টি ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে—ধর্ষণচেষ্টার শিকার: ১২৩ জন,ধর্ষণের শিকার: ৩৩৫ জন
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার: ৮১ জন
ধর্ষণের পর হত্যার শিকার: ২৩ জন নারী ও শিশু
বিচার না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন: ৬ জন নারী
এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৯৭ জন নারী ও শিশু যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
সংস্থাটির মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হওয়ায় চার্জশিট দাখিলে দেরি হয় এবং অনেক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
‘প্রতারণামূলক ধর্ষণ’ অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এক ভুক্তভোগী নারী, মুক্তা (ছদ্মনাম), অভিযোগ করেন—স্বামী মো. জয়নাল আবেদীন খোকন (৪৭) গোপনে তালাক দেওয়ার পরও তা গোপন রেখে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করেন, যা তিনি “প্রতারণামূলক ধর্ষণ” হিসেবে উল্লেখ করেন।তিনি জানান, বিষয়টি জানার পর গেন্ডারিয়া থানা-এ মামলা দায়ের করা হয় এবং প্রথমে আদালত আসামির জামিন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠান। তবে পরবর্তীতে বিশেষ শুনানির মাধ্যমে আপোষের শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।ভুক্তভোগীর দাবি, “আমি কোনো আপোষ চাইনি, আসামিপক্ষও আপোষের আবেদন করেনি। তারপরও জামিন দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দ্রুত জামিন কেন দেওয়া হলো—তার সুষ্ঠু ব্যাখ্যা চাই।”HRCBM এই ঘটনায় জামিন আদেশ বাতিল এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।নরসিংদীর কিশোরী হত্যা প্রসঙ্গ
সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির কনভেনর নরসিংদীর একটি মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ করেন। সেখানে ধর্ষণের বিচার চাওয়ার জেরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় এক তরুণের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে বিচার চাইতে গেলে সুরাহা না পেয়ে উল্টো পরিবারকে এলাকা ছাড়ার চাপ দেওয়া হয়। পরে কিশোরীকে অপহরণ করা হয় এবং পরদিন সকালে একটি সর্ষেক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
সরকারের প্রতি ৬ দফা দাবি
সংস্থাটি সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরে—
১. দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।
২. ফরেনসিক রিপোর্ট নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রদান বাধ্যতামূলক করা।
৩. চার্জশিট দাখিল না হওয়া পর্যন্ত গুরুতর যৌন অপরাধে জামিন স্থগিত রাখা।
৪. পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার।
৫. ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
৬. যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ।
বক্তারা বলেন, “অপরাধী যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।”
সংস্থাটি আশা প্রকাশ করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

